নবী করীম (সঃ) দোয়াকে মুখখুল ইবাদাত অর্থাৎ ইবাদতের মূল বলেছেন। তাই মানুষের আত্ম সংশােধন ও মনকে যাবতীয় অপছন্দনীয় কাজ থেকে মুক্ত রেখে, আল্লাহভীতি ও সৎচরিত্রে ভূষিত হয়ে একমাত্র ভরসাস্থল আল্লাহর দরবারে খালেছদিলে দোয়া করাই কর্তব্য। মানুষের আবেদন ও প্রয়ােজন পূরণ করার যাবতীয় ক্ষমতা এখতিয়ার একমাত্র আল্লাহর হাতে নিবদ্ধ, তিনি হলেন সারা বিশ্বের একমাত্র স্রষ্টা ও প্রতিপালক। আল্লাহপাক বান্দার ডাকা ডাকি-দোয়া প্রার্থনা শুনেন। ও জবাব দেবার ক্ষমতা রাখেন অর্থাৎ তিনি ছাড়া বান্দার অন্তরের কাকুতি-মিনাত শােনার ও জবাব দেবার ক্ষমতা সৃষ্টির মধ্যে থাকতে পারে না। সেলক্ষ্যে মহান আল্লাহ তায়ালা মানুষের অবগতির জন্যে পবিত্র কোরআনে স্পষ্ট করে উদাহরণ। স্বরূপ উল্লেখ করে দিয়েছেন। “একমাত্র আল্লাহকেই ডাকা সত্য ও উচিৎ। আল্লাহকে বাদ দিয়ে লােকেরা যাদেরকে ডাকে, তারা তাদের প্রার্থনায় কোনাে সারাই দিতে পারে না। তাদেরকে ডাকা এমনই, যেমন কোনাে ব্যক্তি পানির দিকে হাত বাড়িয়ে তার কাছে আবেদন জানায় যে, তুমি আমার মুখে পৌছে যাও অথচ পানি তার মুখে পৌঁছিতে সক্ষম নয়। তেমনিভাবে কাফেরদের দোয়াও লক্ষ্য ভ্রষ্ট তীর ছাড়া আর কিছুই নয়।” (আর-রায়াদ: ১৪) মানুষের জ্ঞান-বিবেক খাটিয়ে বুঝা উচিৎ যে, আল্লাহ পাকের যেসমস্ত গুণাগুণ, মর্যাদা ও ক্ষমতা তার সৃষ্টির উপর রয়েছে, সেখানে সৃষ্ট হয়ে স্রষ্টার সমতুল্য কেহই থাকতে পারে না, এমনকি প্রার্থনা, ইবাদত উপাসনা লাভের অধিকারী বলে গন্য হয়না। এরপরেও যারা ক্ষমতাহীন সত্তার সামনে মাথানত করে বিনয় ও কৃতজ্ঞতার সাথে মনের বাসনা পূরণের আবেদন জানায়, তখন সে কিছুই পায়না বরং নিরাশ হতে হয়। তার কারণ হচ্ছে যে, একজন পরনির্ভরশীল অন্য একজন পরনির্ভরশীলকে যেমন দিতে পারেনা, তেমনি রক্ষা করতেও অক্ষম থাকে। মানুষের মধ্যে কিছু মানুষ রয়েছে, যারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে দুনিয়ার অন্যান্য সত্তার ইবাদাত উপাসনা করে এবং তাদেরকে লক্ষ্য করে নানান দরখাস্ত পেশ করে বা ডাকে, তারা হলাে সবচেয়ে বেশী পথভ্রষ্ট ও ক্ষতিগ্রস্ত । আল্লাহপাক বলেন: “ঐ লােকের চেয়ে বেশী গোমরাহ (পথ) আর কে হতে পারে? যে আল্লাহকে বাদ দিয়ে এমন কাউকে ডাকে, যে কিয়ামত পর্যন্ত তার ডাকে সাড়া দিতে সক্ষম নয়। এমনকি তাদেরকে যে ডাকা হয়েছে সে কথা তারা জানেই না। যখন সব মানুষকে সমবেত করা হবে তখন যারা তাদেরকে ডাকতো, তারা তাদের দুশমন হয়ে যাবে এবং তাদের ইবাদতকে অস্বীকার করবে”। (আল-আহকাফ: ৫-৬) | আল্লাহকে বাদ দিয়ে যেসমস্ত লােক মন্দিরে মূর্তির সামনে ভক্তি সহকারে আবেদন জানায় এবং কেহ কেহ দরগাহ বা মাজারে গিয়ে সেখানে শায়িত ব্যক্তিদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে অথবা আশা পূরনের জন্যে দোয়া করে সেসব। লােক হলাে সবচেয়ে বেশী পথভ্রষ্ট । এছাড়া দরগা মাজার ও মন্দির যে কোনাে জায়গায় গিয়ে তাদেরকে লক্ষ্য করে কিছু চাওয়া অর্থাৎ অভাব মােচনকারী, মনের। বাসনা পূরণকারী ইত্যাদি মনে করে যে সমস্ত আকুল আবেদন জানানাে হয়, সে সমস্ত দরখাস্তের জবাব দেওয়াতাে দূরের কথা বরং এসমস্ত তাদের কানেই পৌছে। । যার ফলে বিচারের দিন মানুষের এসমস্ত কর্মকান্ডের কথা অস্বীকার করে তাদের শত্রু হয়ে দাঁড়াবেন। ৪8 19 21:08 প্রকৃতপক্ষে, মানুষের মনের আশা-আকাংখা দুঃখ বেদনা যাবতীয় ব্যাপারে দোয়া প্রার্থনা করা উচিৎ হবে সেই মহান শক্তিশালী সত্তার কাছে, যিনি হবেন। মানুষের মুনিব, মালিক, প্রতিপালক এবং সারা বিশ্বের ব্যবস্থাপক। এছাড়া। মানুষের ভাল-মন্দ, লাভ-ক্ষতি, তকদিরের প্রবর্তক, জীবন-মরণ ইত্যাদি যাবতীয়। সব কিছুর ক্ষমতা যার হাতে নিবদ্ধ, তিনি হলেন মহান আল্লাহ রাব্বল আলামীন। তিনি ছাড়া আর কোনাে মাবুদ নেই এবং তিনি হলেন চিরস্থায়ী সর্বদ্রষ্টা ও সর্বশ্রোতা। তাছাড়া সমস্ত রত্মভান্ডারের চাবি সমূহ একমাত্র তাঁরই আয়ত্বাধীন । লে হিসেবে মানুষের ভরসাস্থল, দোয়া-প্রার্থনা ও সমস্ত ইবাদত উপসনা পাওয়ার। অধিকারী হবেন শুধুমাত্র আল্লাহ তায়ালা । যার কোন শরীক নেই অর্থাৎ একক, অদ্বিতীয় ও স্বয়ং সম্পূর্ণ । পবিত্র কোরআনে ঘােষণা রয়েছে: “আল্লাহ প্রতিটি জিনিসের স্রষ্টা এবং তিনিই সব কিছুর হেফাজতকারী (রক্ষক)। আসমান ও জমিনের সকল ভান্তারের চাবিসমূহ তাঁরই কাছে। যারা আল্লাহর আয়াত সমূহের সাথে কুফরী করবে তারাই ঐসব লােক, যারা ক্ষতিগ্রস্ত।” (আয-যুমার: ৬২-৬৩) আল্লাহপাক আরাে বলেন: “তােমাদের রব বলেন, আমার কাছে দোয়া করাে, আমি কবুল করবাে। যারা অহংকার করে আমার দাসত্ব থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে, তারা অচিরেই অপমানিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” (সূরা-মু'মিন: ৬০)
আল্লাহপাক হলেন সমস্ত প্রশংসা, নিয়ামত ও অনগ্রহের অধিকারী । সে জন্য একমাত্র তারই কাছে দরখাস্ত পেশ করতে হবে। দোয়া হচ্ছে আল্লাহর রহমত লাভের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম এবং দাসত্ব, বন্দেগী ও আনুগত্যের নামান্তর। যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে দোয়া করে, তাদের উপর আল্লাহ খুশী হন। আর যারা দোর করেন, তারা আল্লাহর ধার ধারে না অর্থাৎ মুনিবের কাছে দাসত্বের স্বীকৃতি দিতে দ্বিধা করে, যার ফলে আল্লাহ তাদের উপর রাগ করেন। কারণ যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনাে সত্তার কাছে দোয়া করে বা সাহায্যের আশায় ডাকে, তার নামে মানত করে অর্থাৎ যে সব বৈশিষ্ট ও গুণাবলী একমাত্র আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট, সে সমস্ত এসব সত্তার মধ্যেও রয়েছে বলে বিশ্বাস করে তাদের গােলামীতে লিপ্ত থাকে, তারা সবই এক আল্লাহর গােলাম। তাই গােলাম হয়ে যে অন্য গােলামের সামনে আনুগত্য সহকারে সাহায্য চায়, সে আসলেই শিরক কর্মে লিপ্ত হয়। আর এসমস্ত মানুষের জন্যেই তাদের কর্মফল হিসেবে আল্লাহ পাক জাহান্নাম নির্দিষ্ট করে রেখেছেন ।। সুতরাং আল্লাহর আযাব থেকে বাঁচতে হলে মানুষের শিরকমুক্ত ঈমান ও ইবাদাত হতে হবে এবং যাবতীয় প্রশংসা, মর্যাদা, গৌরব, ইবাদাত- উপসনা পাওয়ার অধিকারী হিসেবে একমাত্র আল্লাহকেই মেনে নিতে হবে। ইবাদাতের বেলায় আল্লাহর সাথে যেমন সম্পর্ক রয়েছে, তেমনিভাবে দোয়া প্রার্থনা অভাব প্রয়ােজন ও মনের বাসনা পূরনের ক্ষেত্রেও তিনির কাছে ধর্না দিয়ে মুনিব ও গােলামের সম্পর্ক বজায় রাখা লাগবে । সারকথা হচ্ছে, আমরা যেন ভুলে না যাই। সেই প্রতিজ্ঞা, যা প্রত্যেক নামাযের প্রতি রাকাতে নীরবে সরবে, নির্জনে প্রকাশ্যে সূরা ফাতিহা পাঠ করে আল্লাহর কাছে নিবেদন করে বলতে থাকি “আমরা কেবল তােমারই গােলামী করি এবং তােমারই কাছে সাহায্য কামনা করি। আল্লাহ ছাড়া নেই কোনাে সাহায্যকারী কথাটিও আমাদেরকে জানিয়েছেন সূরা আহযাবের ১৭নং আয়াতে, “বলাে! আল্লাহ তােমাদের ক্ষতি করতে ইচ্ছা করলে কে এমন আছে তা হতে রক্ষা করবে? বা তিনি অনুগ্রহ করতে চাইলে কে আছে বাঁধা দিতে? আল্লাহ ছাড়া ওরা পাবেনা কাউকে রক্ষক ও সাহায্যকারী।” অন্য আয়াতে রয়েছে: “আল্লাহ যদি তােমার উপর কোনাে কষ্ট দিতে চান তাহলে কেউ তা দূর করতে পারবেনা তিনি ছাড়া পক্ষান্তরে যদি তিনি তােমার কল্যাণ করতে চান তবে তিনির অনুগ্রহকে কেউ বাঁধা দিতে পারবে না।” (সূরা-ইউনুস: ১০৭)

0 coment rios: