একদিন নৌকাযােগে কিছু লােক নদী পাড়ি দিচ্ছিল । তাদের মধ্যে একজন গর্ভবতী সুন্দরী মেয়ে ছিল । হঠাৎ এক দুর্ঘটনায় নৌকাটি ডুবে গেল । ফলে সবাই নদীতে ডুবে মারা যায় । কিন্তু উক্ত মেয়েটি জীবিতাবস্থায় তার উপর ভাসছিল । দয়ালু আল্লাহর কৃপায় ঐ অবস্থায় এক শিশু জন্মগ্রহণ করে এবং সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটির মৃত্যু ঘটে । কিন্তু শিশুটি জীবিত থাকে । তক্তাটি ভাসতে ভাসতে নদীর কিনারে পৌছলে এক জেলে সেই শিশুকে বাড়ীতে নিয়ে যায় । শিশুটির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে জেলেদের সন্তানহীনা সর্দার তাকে ক্রয় করল । শিশুটি সর্দারের গৃহে লালিত - পালিত হতে লাগল । তার নাম রাখলাে শাদ্দাদ । এক দিন এক বৃদ্ধ ভিক্ষুক আল্লাহর কাছে ধনরত্ন চেয়ে করুণভাবে প্রার্থনা । করল । তার এই করুণ প্রার্থনায় ফেরেশতাগণ বিচলিত হয়ে আল্লাহর কাছে তাকে ধনরত্ন দেওয়ার জন্য আবেদন করলেন । আল্লাহ বললেন , “ হে ফেরেশতাগণ ! তার ভাগ্যে ধনরত্ন নাই । ” ফেরেশতাগণ বললেন , “ আপনি দয়ালু , আপনি ইচ্ছা করলেই দিতে পারেন । " তার ভাগ্য প্রমাণ করবার জন্য আল্লাহ ফেরেশতাগণকে বললেন , “ বেহেশত হতে সুরামাসহ সুরমাদানী তার সামনে ফেলে রাখ । ” তিনি আরও বললেন , “ এই সুরমা চোখে লাগানাের সঙ্গে সঙ্গে মাটির নীচে সমস্ত ধনরত্ন দেখতে পাবে । ” ফেরেশতাগণ আল্লাহর হুকুমে ঐ ভিক্ষুকের পথের সামনে সুরমাদানীটি রেখে দিল । কিন্তু ভিক্ষুক সুরমাদানীর সামনে এসে কি মনে করে চোখ বন্ধ করল এবং অন্ধরা কিভাবে পথ চলে তা পরীক্ষা করে দেখল । সুরমাদানী পার হয়ে গিয়ে চোখ খুলে আবার চলতে লাগল । কিছুক্ষণ পর কয়েকজন সৈনিক ঐ পথ দিয়ে যাচ্ছিল । তারা সুরমাদানীটি দেখতে পেয়ে তা উঠিয়ে নেয় এবং তার গুণাগুণ । পরীক্ষার জন্য পথের পাশে খেলারত বালক শাদ্দাদকে ডেকে তার চোখে সুরমা লাগাতে চাইল । বালক শাদ্দাদ চোখে সুরমা লাগাল এবং সঙ্গে সঙ্গে সে মাটির নীচের ধনরত্ন দেখতে পেল । ধূর্ত বালক মনে মনে ফন্দি এটে চীকার করে উঠলাে , “ তােমরাত আমার চোখে সুরমা দিয়ে আমাকে অন্ধ করে দিলে । অসহ্য জ্বালা করছে । ”
সৈন্যরা বালকের দুর্দশা দেখে সুরমাদানী ফেলে তাড়াতাড়ি সেখান হতে সরে পড়লাে । তারা চলে যেতেই বালকটি সুরমাদানী নিয়ে বাড়ী আসল । তখন আল্লাহ ফেরেশতাগণকে ডেকে বললেন , “ হে ফেরেশতাগণ ! ঐ বৃদ্ধের ভাগ্যে ওটা । নাই , বালকটির ভাগ্যেই ছিল । আজলের দিবসে তারা ঐরূপ ভাগ্যই কুড়িয়েছিল । " অতঃপর সেই বালক শাদ্দাদ বাদশাহ শাদ্দাদ ন | মে পরিচিত হলাে এবং সে শয়তানের প্ররােচনায় নিজেকে খােদা বলে দাবী করল । এইভাবে রাজ্যময় আল্লাহর অবিশ্বাস ও ধর্মহীনতায় ডুবে গেল । একদিন হযরত হুদ ( আঃ ) শাদ্দাদের নিকট গিয়ে বললেন , “ হে শাদ্দাদ ! আল্লাহ ব্যতীত কেউ উপাস্য নাই , আমি তার প্রেরিত পুরুষ । যিনি সারা দুনিয়ার মালিক এবং সমস্ত কিছু সৃষ্টি করেছেন তাকে সেজদা কর । এতে তােমার মঙ্গল হবে । আল্লাহ তােমাকে বেহেশত দান করবেন । শাদ্দাদ বলল , “ তােমার আত্মাহর বেহেশতের বিষয় বর্ণনা করে শুনাও । " হযরত হুদ ( আঃ ) তাকে বেহেশতের সৌন্দর্যসমূহ বর্ণনা করে শুনালেন । তা শুনে শাদ্দাদ বলল , “ হে হুদ ! আমি তােমার আল্লাহর বেহেশতের বর্ণনা শুনলাম । আমি নিজেই ঐরূপ বেহেশত তৈরী করব এবং সুখ শান্তিতে জীবন যাপন করব । তােমার আল্লাহর বেহেশতের আমার কোন প্রয়ােজন নাই । " এটা শুনে রাজপরিষদগণও তাকে সমর্থন করল । বেহেশত তৈরীর যুক্তি পরামর্শ দিতে লাগল এবং বেহেশতের জন্য স্থান নির্ধারণ করল । চারশত মাইল দৈর্ঘ্য প্রস্থের বেহেশত নির্মাণের কাজ শুরু হলাে । স্বর্ণ , রৌপ্য ও হীরা - জহরত দ্বারা আসন প্রস্তুত করে নিপুণভাবে সমস্ত বেহেশতটি সাজানাে হলাে । নানারূপ ফল - ফুলের বৃক্ষ রােপণ করে বেহেশতের সৌন্দর্য বাড়ানাে হলাে এবং দেশের সুন্দরী মেয়েদের বেহেশতবাসীদের খেদমতের জন্য নিয়ােগ করা হল । বেহেশতের সমস্ত কাজ সমাপ্ত হলাে । বাদশাহ শাদ্দাদ বেহেশতে গমনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে লাগল । হায় দুর্ভাগ্য ! বাদশাহ শাদ্দাদ যখন পারিষদসহ বেহেশতে প্রবেশ করার জন্য প্রবেশ দ্বারে পৌঁছল , তখন তার সামনে পথরােধ করে যমদূত দাঁড়ালো । বাদশাহ শাদ্দাদ রাগান্বিত হয়ে বলল , “ কে তুমি ? আমার পথ ছাড় । আমি বেহেশতে প্রবেশ করছি দেখছাে না ? " যমদূত উত্তর করল , “ আমি মালাকুল মউত , আল্লাহর আদেশে তােমার জান ক্য করতে আসছি । " বাদশাহ শাদ্দাদ বলল , “ আমার আকাক্ষিত বেহেশতে প্রবেশ করার সুযােগ চাই । " উত্তরে যমদূত বলল , “ সে সুযােগ তােমাকে দেওয়া হবে না । দোযখে । প্রবেশের জন্য তৈরী হও । ” তার কথা শেষ হতেই শাদ্দাদের জান কবয করা হলাে । তার বেহেশত দেখার সৌভাগ্য হলাে না । তার প্রাণহীন দেহ ধূলায় লুটিয়ে পড়লাে । " সৃষ্টিকর্তার সমকক্ষ হওয়া সম্ভব নয় । অহঙ্কারীদের পতন অনিবার্য ।


0 coment rios: