🔳 প্রথম ধাপের নাম ইয়াউমুল মাউত!
এই দিনেই মানুষের জীবনের সমাপ্তি ঘটবে, জীবন ফুরিয়ে যাবে। আল্লাহ ফেরেশতাদের আদেশ করবেন জমিনে গিয়ে জান কবজ করে নিয়ে আসার জন্য ।বিষয়টি অত্যান্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, কেউ এই দিনের কথা জানেনা। যে দিন তার জান কবজ করা হবে সেইদিন ও সে জানবে না আজ তার জান কবজ করার দিন। মৃত্যুর বিষয়টি উপলব্ধি না করা সত্বেও শরীরে কিছু পরিবতর্ন অনুভব করবে। ইমানদারের অন্তরে প্রশান্তি অনুভব হবে, আর পাপিষ্ঠদের বুকে কষ্ট চাপ অনুভব করবে। এই সময় শয়তান এবং জীন ফেরেশতাদের নামতে দেখবে। কিন্তু আমরা কেউ তাদের দেখবোনা। এই বিষয়টি কোরআনে আছে
﴿وَاتَّقُوا يَوْمًا تُرْجَعُونَ فِيهِ إِلَى اللَّهِ ۖ ثُمَّ تُوَفَّىٰ كُلُّ نَفْسٍ مَّا كَسَبَتْ..﴾
তোমরা সেই দিনকে ভয় কর যেদিন তোমাদের ফিরিয়ে নেওয়া হবে আল্লাহর দরবারে । অতপরঃ প্রতিটি নফসকে বুঝিয়ে দেওয়া হবে তার কর্মফল। (সূরা বাক্বারা)
🔳 এরপর আসবে দ্বিতীয় ধাপ!
এটা হচ্ছে ধীরেধীরে জান কবজ করার পালা। এই ধাপে মানুষের রুহ পায়ের পাতা থেকে শুরু করে গোছা, হাটু,পেট,নাভি ও বুকের উপর হয়ে মানুষ দেহের "তারাক্বী" নামক জায়গায় পৌছে যায়। এই সময় মানুষ অস্থিরতা অনুভব করেন। এবং একধরণের অসহনীয় বুুকে চাপ অনুভব করবেন। তখনও তিনি জানতে পারবেন না যে তার জান কবজ করা হচ্ছে ।
🔳 তারপর শুরু হয় তৃতীয় ধাপ!
এই ধাপের নাম " তারাক্বী " কোরআনে এই স্তরের কথা বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে ;
﴿كَلَّا إِذَا بَلَغَتِ التَّرَاقِيَ وَقِيلَ مَنْ رَاقٍ وَظَنَّ أَنَّهُ الْفِرَاقُ وَالْتَفَّتِ السَّاقُ بِالسَّاقِ
﴾ (سورة القیامة
‘কখনও না, যখন প্রান কণ্ঠাগত হবে। এবং বলা হবে, কে ঝাড়বে। এবং সে মনে করবে যে, বিদায়ের ক্ষন এসে গেছে’।পায়ের গোছা অন্য গোছার সাথে জড়িয়ে যাবে। ( সূরা কিয়ামাহ )
তারাক্বী বলা হয় কণ্ঠনালিরর নিচে ২ কাধ পর্যন্ত বিস্তৃত হাড়কে। "কে ঝাড়বে" অর্থাৎ আত্মিয়-স্বজনদের কেউ কেউ বলবে : ডাক্তার ডাকি, অন্যজন বলবে ইমারজেন্সিতে কল করি, আবার কেউ বলবে কোরআন পড়ে ফু দেই। এই অবস্থার মধ্যে ও মানুষ জীবনে ফিরে আসার কথা চিন্তা করতে থাকবে । সে বিশ্বাসই করতে চাবেনা যে রুহু তার দেহ ত্যাগ করছে! (وَظَنَّ أَنَّهُ الْفِرَاقُ সে মনে করবে,বিদায়ের ক্ষন এসে গেছে ) অর্থাৎ সে এখনো মৃত্যুর বিষয়ে নিশ্চিত নয়।সে বাচার জন্য অনেক চেষ্টা করতে থাকবে। কিন্তু আল্লাহ তা'লা বলেন :(وَالْتَفَّتِ السَّاقُ بِالسَّاقِ) পায়ের গোছা অন্য গোছার সাথে জড়িয়ে যাবে )
অর্থাৎ মৃত্যুর বিষয়টি এখন চূড়ান্ত হয়েগেছে । রুহু গোছাদ্বয় থেকে বেরিয়ে গেছে।সে আর পা নাড়াইতে চাইলেও পা নাড়াতে পারবেনা।এবং রুহু শরীর থেকে বের হয়ে তারাক্বীতে পৌছে গেছে।
("كَلَّا إِذَا بَلَغَتِ التَّرَاقِيَ")
‘কখনও না, যখন প্রান কণ্ঠাগত হবে!
🔳 অতঃপর আসবে চতুর্থ ধাপ। এই ধাপের নাম হুলক্বুউম :
মৃত্যুর এটাই শেষ স্তর এবং মানুষের জন্য চূড়ান্ত পর্যায়ের অনেক কষ্টদায়ক কঠিন স্তর। ঠিক এই সময় তার চোখের পর্দা সরিয়ে দেওয়া হবে।এবং সে তার চারপাশের ফেরেশতাদের দেখতে পাবে। এখান থেকেই আখেরাত দর্শনের স্তর শুরু হবে।
فَكَشَفْنَا عَنكَ غِطَاءَكَ فَبَصَرُكَ الْيَوْمَ حَدِيدٌ ﴾ ( سورة - ق)
আমি তোমার সামনে থেকে পরদা সরিয়ে দিয়েছি, এখন তোমার দৃষ্টি প্রখর। (সূরা ক্বফ)
এই স্তরকে হুলক্বুউম নামকরণ করা হয়েছে আল্লাহর কালামের কারনে :
{ فَلَوْلَا إِذَا بَلَغَتْ الْحُلْقُوم وَأَنْتُمْ حِينَئِذٍ تَنْظُرُونَ وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْكُمْ وَلَكِنْ لَا تُبْصِرُونَ }
প্রান যখন কণ্ঠাগত হয় তখন তোমরা তাকিয়ে থাক। আমি তোমাদের চেয়ে তার নিকটবর্তি। কিন্তু তোমরা তা দেখতে পাওনা। (সূরা ওয়াকিয়াহ )
ُআল্লাহ তার পাশের উপস্থিত মানুষদের কে সম্বোধন করে বলছেন ; তোমরা যেখানে আছো সেও সেখানেই আছে ।সে যা দেখতে পারতেছে তোমরা তা দেখতে পাচ্ছ না। সে ইমানদার হলে আল্লাহ তাআলার রহমত দেখবে এবং যদি পাপিষ্ঠ হয় আল্লাহর আজাব এবং গজব দেখছে। এজন্যই আমরা তাকে দেখি নির্দিষ্ট একটি জায়গায় একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে।
وَنَحْن أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْكُمْ وَلَكِنْ لَا تُبْصِرُونَ
অর্থাৎ আমি তোমাদের তার অধিক নিকটতর কিন্তু তোমরা তা দেখতে পাও না । মানুষের জান কবজ এর সময়টা জীবনের সবথেকে কষ্টদায়ক কঠিন মুহূর্ত। তখন সে আল্লাহর সকল প্রতিশ্রুতি ও ভীতি দেখতে পায়। ফেরেশতাদের দেখতে পায়। তার জীবনে যত আমল করেছে তা চোখের সামনে তুলেধরা হয়ে থাকে। আর এই সময় মৃত্যুর ফেতনা ঘটে যায়। শয়তান এই ফেতনায় প্রবেশ করে এবং বিশ্বাসে সন্দেহ ঢুকিয়ে দেয়। আল্লাহ ও নবীর ব্যাপারে,দ্বীনের ব্যাপারে ও কোরআন হাদিসের ব্যাপারে সন্দেহ সৃষ্টি করতে থাকে তার অন্তরে। এবং শয়তান তার সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করতে থাকে যেন সে বে ঈমান হয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়। এইসময় শয়তান নিশ্চিত হয়ে যায় যে এটা এই মানুষটির শেষ সময় এবং মালাকুল মাউত তার নিকটবর্তী। এজন্যই কোরআন আমাদের মৃত্যুর ফেতনা থেকে আল্লাহর আশ্রয় নিতে বলছে :
﴿وَقُلْ رَبِّ أَعُوذُ بِكَ مِنْ هَمَزَاتِ الشَّيَاطِينِ(۹۷) وَأَعُوذُ بِكَ رَبِّ أَنْ يَحْضُرُونِ﴾ (سورة المؤمنون).
আপনি বলুন ;হে আমার রব! আমি আপনার নিকট আশ্রয় চাচ্ছি শয়তান থেকে। এবং আমি আপনার নিকট আশ্রয় চাচ্ছি তাদের উপস্থিতি থেকে। (সূরা মুমিন)
তুমি যদি সঠিক পথে তোমার জীবন পরিচালিত করো, এবং যদি অন্তরে আল্লাহ তার রাসুল এর প্রতি ভালোবাসা থাকে তাহলে তুমি এই অবস্থায় দুনিয়া থেকে মুমিন হয়ে বের হবে। মৃত্যুর শেষ মুহূর্তে শয়তান তার কোন একজন নিকটাত্মীয়ের আকৃতিতে উপস্থিত হবে যিনি আগেই মারা গেছেন। সে উচ্চকণ্ঠে চিৎকার করে বলবে ; আমি তোমার পূর্বে মারা গিয়েছি । ইসলাম সত্য ধর্ম নয় এবং নবী সত্য দ্বীন নিয়ে আসেননি। এবং তোমাকে বলবে; তুমি সবকিছু অস্বীকার করো।
এই পরিস্থিতির কথা আল্লাহ তাআ'লা কোরআনে বর্ণনা করেন;
﴿كَمَثَلِ الشَّيْطَانِ إِذْ قَالَ لِلْإِنسَانِ اكْفُرْ فَلَمَّا كَفَرَ قَالَ إِنِّي بَرِيءٌ مِّنكَ إِنِّي أَخَافُ اللَّهَ رَبَّ الْعَالَمِينَ﴾ ١٦).
তাদের তুলনা হচ্ছে শয়তান যখন সে মানুষকে বে ইমান করে পেলবে। যখন মানুষ শয়তানের কথায় কুফরি করবে তখন শয়তান তুুমাকে বলবে তোমার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নাই ।আমি আল্লাহকে ভয় করি। (সূরা হাশর)
🔳 এরপর পঞ্চম ধাপ শুরু হবে !
এই সময় আজরাইল আলাইহিস সালাম প্রবেশ করবেন। এই সময় মানুষ বুঝতে পারবে সেকি জান্নাতি না জাহান্নামী। সে তার আমলনামা দেখবে এবং তার পরিণতি সম্পর্কে জানতে পারবে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই স্তর নিয়ে বিস্তারিত বলেছেন। বিশেষভাবে যারা বিভিন্ন গুনাহে লিপ্ত ছিল এবং তাওবা না করেই আল্লাহর সাথে মিলিত হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন;:﴿وَالنَّازِعَاتِ غَرْقًا﴾
শপথ সেই ফেরেশতাদের যারা নির্মমভাবে(রুহ) টেনে বের করে।(সূরা নাযিয়াত)
জাহান্নামে একদল ফেরেশতা থাকবে যারা আগুনের কাফন প্রস্তুত করে এবং খুব নির্দয়ভাবে পাপীষ্ট ব্যক্তির রুহ কবজ করে। অন্য আয়াতে এই কঠিন পরিস্থিতির চিত্র বর্ণিত হয়েছে ;
﴿فَكَيْفَ إِذَا تَوَفَّتْهُمُ الْمَلَائِكَةُ يَضْرِبُونَ وُجُوهَهُمْ وَأَدْبَارَهُمْ﴾
ফেরেশতারা যখন তাদের মুখমন্ডল এবং পৃষ্ঠদেশে আঘাত করতে করতে তাদের রুহ হরণ করবে তখন তাদের কী দশা হবে???(সূরা মোহাম্মদ)
🔳 এই ধাপের পর শুরু হবে ষষ্ঠ ধাপ!
এই ধাপে মানুষের রুহ প্রস্তুত হয়ে তারাক্বীর উপর সম্ভাব্য সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে যাবে। এবং রুহ বের হওয়ার জন্য এবং আজরাইল আলাইহিস সালাম এর নিকট আত্মসমর্পণের জন্য নাকে মুখে অবস্থান করবে। বান্দা যদি গুনাহগার হয় তখন আজরাইল তাকে বলবে;হে নিকৃষ্ট আত্মা! তুই আগুন ও জাহান্নামের এবং ক্রোধান্বিত ও পপ্রতিশোধপরায়ন রবের উদ্দেশ্যে বের হয়ে আস। তখন তার আভ্যন্তরীণ চেহারা কালো হয়ে যাবে। এবং চিৎকার করে বলবে ;
﴿رَبِّ ارْجِعُونِ. لَعَلِّي أَعْمَلُ صَالِحًا فِيمَا تَرَكْتُ ۚ﴾
হে আমার রব! আমাকে পুনরায় পাঠান যাতে আমি সৎকাজ করি যা আমি পূর্বে করিনি। (সূরা মুমিন)
কারন আমি নেককাজ করতে পারিনি।তখন সে শুনতে পাবে;
﴿كَلَّا ۚ إِنَّهَا كَلِمَةٌ هُوَ قَائِلُهَا ۖ وَمِن وَرَائِهِم بَرْزَخٌ إِلَىٰ يَوْمِ يُبْعَثُونَ﴾
না এটা হতে পারেনা। এটা তো তার একটি উক্তিমাত্র। তাদের সামনে বারযাখ থাকবে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত। (সূরা মুমিন)
আল্লাহ তা'লা আরও বলেন;
وَجَاءَتْ سَكْرَةُ الْمَوْتِ بِالْحَقِّ ذَلِكَ مَا كُنْتَ مِنْهُ تَحِيدُ
মৃত্যুযন্ত্রণা অবশ্যই অবশ্যই আসবে, যা থেকে তুমি পালাচ্ছিলে।(সুরা ক্বফ)
﴿قُلْ إِنَّ الْمَوْتَ الَّذِي تَفِرُّونَ مِنْهُ فَإِنَّهُ مُلَاقِيكُمْ﴾
আপনি বলুন; যেই মৃত্যু থেকে তোমরা পালায়ন কর সেই মৃত্যুর সাথে তোমাদের সাক্ষাত হবেই। (সূরা জুমআ'হ)
💥শেষ কথা
আমরা কেন মৃত্যুকে ভয় পাই?
এর উত্তরঃ কারণ তোমরা দুনিয়াকে গ্রহণ করেছ আর আখেরাতকে প্রত্যাখ্যান করেছ।
যে মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ করবে সে আখেরাতের জন্য বেশি প্রস্তুত থাকবে।
فاكثروا من ذكر هادم اللذات
“তোমরা সকল স্বাদ কর্তনকারী মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ করো। আল্লাহ তাআ'লা যে আমাদের বেশি বেশি নেক কাজ করার তাওফিক দান করেন।